প্রয়াত কিংবদন্তি রবীন্দ্রসংগীত শিল্পী অর্ঘ্য সেন

না ফেরার দেশে কিংবদন্তি শিল্পী অর্ঘ্য সেন। রবীন্দ্রসঙ্গীত মানেই কেবল সুর নয়, ভাবের সাধনা। সেই সাধনার পথেই আজীবন হেঁটেছেন অর্ঘ্য সেন। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৯০ বছর। বার্ধক্যজনিত কারণে বেশ কিছু দিন ধরেই অসুস্থ ছিলেন তিনি। ১৪ জানুয়ারি, বুধবার সকালে থেমে যায় তাঁর জীবনযুদ্ধের লড়াই। তাঁর কণ্ঠে রবীন্দ্রনাথের গান যেন শুধু শোনা নয়, অনুভব করা যায়। প্রজন্মের পর প্রজন্ম তাঁর গানে খুঁজে পেয়েছে আশ্রয়, শান্তি আর আত্মিক স্পর্শ। রবীন্দ্রসঙ্গীতের ইতিহাসে তাই অর্ঘ্য সেন শুধুই একজন শিল্পী নন, তিনি এক অনুভূতির নাম। অর্ঘ্য সেনের গানে রবীন্দ্রনাথ যেন আরও অন্তরঙ্গ হয়ে উঠতেন। ‘আমার হিয়ার মাঝে লুকিয়ে ছিলে’ বা ‘আমার মাথা নত করে দাও’—এই গানগুলো আজও শ্রোতার হৃদয়ে নিঃশব্দে ঢেউ তোলে। ১৯৩৫ সালের ১১ নভেম্বর অবিভক্ত বাংলার ফরিদপুরে মামার বাড়িতে জন্ম অর্ঘ্য সেনের। আদি ভিটে ছিল খুলনার সেনহাটি গ্রামে। কৃষিবিজ্ঞানী বাবা এবং সঙ্গীতপ্রাণ মায়ের আশ্রয়ে বড় হয়ে ওঠা অর্ঘ্যর গানের হাতেখড়ি হয়েছিল মায়ের কাছেই। পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত ফরিদপুরে পড়াশোনার পর চলে আসেন কলকাতায়। বালিগঞ্জ গভর্নমেন্ট হাই স্কুল থেকে ম্যাট্রিকুলেশন এবং পরে সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজ থেকে বিজ্ঞানে স্নাতক হন তিনি। ইন্ডিয়ান স্ট্যাটিস্টিক্যাল ইনস্টিটিউটে (ISI) কর্মজীবন শুরু করে দীর্ঘ সময় ন্যাশনাল স্যাম্পল সার্ভে অর্গানাইজেশন (NSSO)-এ উচ্চপদে দায়িত্ব পালন করেছেন। কর্মজীবনের ব্যস্ততার মাঝেও রবীন্দ্রসঙ্গীতের চর্চা থেকে বিচ্যুত হননি তিনি। ছাত্রাবস্থায় পঙ্কজকুমার মল্লিকের রেডিওর গান শুনে অনুপ্রাণিত হয়েছিলেন অর্ঘ্য সেন। অশোকতরু বন্দ্যোপাধ্যায়ের কাছে প্রাথমিক তালিম নিলেও, তাঁর গানের মোড় ঘুরে যায় প্রবাদপ্রতিম শিল্পী দেবব্রত বিশ্বাসের (জর্জ) সান্নিধ্যে এসে। দেবব্রত বিশ্বাসের ভাবশিষ্য হিসেবে তাঁর শুদ্ধ উচ্চারণ এবং শব্দের গভীরতাকে স্পর্শ করার ক্ষমতা শ্রোতাদের মোহিত করত। ‘আমার হিয়ার মাঝে লুকিয়ে ছিলে’ কিংবা ‘আমার মাথা নত করে দাও’-এর মতো কালজয়ী গানগুলো তাঁর কণ্ঠে এক বিশেষ মাত্রা পেয়েছিল। রবীন্দ্রসঙ্গীতের প্রসারে সারাজীবনের অবদানের জন্য ১৯৯৭ সালে তিনি ভারত সরকারের ‘সঙ্গীত নাটক অকাদেমি’ পুরস্কারে ভূষিত হন। এছাড়াও পরবর্তীকালে তিনি ‘টেগোর ফেলো’ সম্মান লাভ করেন। শিল্পীর প্রয়াণে শোকের ছায়া সঙ্গীতমহলে। সঙ্গীতশিল্পীর মৃত্যুতে শোকপ্রকাশ করেছেন রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। শোকবার্তায় মুখ্যমন্ত্রী লেখেন, ‘বিশিষ্ট রবীন্দ্রসংগীত শিল্পী অর্ঘ্য সেনের প্রয়াণে আমি গভীর ভাবে শোকাহত। তাঁর চলে যাওয়া বাংলা সাংস্কৃতিক জগতের এক অপূরণীয় ক্ষতি। আমি তাঁর বিদেহী আত্মার শান্তি কামনা করি। আমি তাঁর শোকসন্তপ্ত পরিবার ও অসংখ্য অনুরাগীদের প্রতি গভীর সমবেদনা জানাই।’