প্রয়াত বর্ষীয়ান সাহিত্যিক মণিশংকর মুখোপাধ্যায়। যাঁকে বাঙালি পাঠক চেনে শংকর নামে। বয়স হয়েছিল ৯২। এক বেসরকারি হাসপাতালে শুক্রবার দুপুরে তিনি শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন। দীর্ঘদিন বয়সজনিত সমস্যায় ভুগলেও গত বইমেলাতেও হাজির ছিলেন পাঠকদের মাঝে। তবে এবারের বইমেলায় উপস্থিত ছিলেন না। মাত্র কয়েকদিন আগেই শেষ হয়েছে মেলা। এবার চিরকালের জন্য অমৃতলোকে পাড়ি দিলেন শংকর। রয়ে গেল তাঁর সৃষ্টি। যা পাঠকের হৃদয়ে থেকে যাবে অমর, অক্ষয় হয়ে। বাংলা সাহিত্য-সংস্কৃতি জগতের নক্ষত্রপতনে শোকপ্রকাশ করেছেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। এক্স হ্যান্ডেলে শোকপ্রকাশ করে মুখ্যমন্ত্রী লিখেছেন, “বাংলার প্রখ্যাত সাহিত্যিক মণিশংকর মুখোপাধ্যায় (শংকর)-এর প্রয়াণে আমি গভীরভাবে শোকাহত। তাঁর প্রয়াণে বাংলা সাহিত্য জগতের একটি উজ্জ্বল নক্ষত্রের পতন হল।” তাঁর সৃষ্টিতে কীভাবে আমজনতার সুখ-দুঃখ থেকে জীবনসংগ্রামের কাহিনি ফুটে উঠত, সেকথা উল্লেখ করে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সংযোজন, “‘চৌরঙ্গী’ থেকে ‘কত অজানারে’, ‘সীমাবদ্ধ’ থেকে ‘জনঅরণ্য’- তাঁর কালজয়ী সৃষ্টিগুলি প্রজন্মের পর প্রজন্ম বাঙালি পাঠককে মুগ্ধ করেছে। তাঁর লেখনীর আধারে উঠে এসেছে সাধারণ মানুষের জীবনসংগ্রামের না বলা কথা। বিশেষ করে স্বামী বিবেকানন্দকে নিয়ে তাঁর সুগভীর গবেষণা ও গ্রন্থসমূহ আমাদের অমূল্য সম্পদ। শংকরের প্রয়াণ আমাদের সাংস্কৃতিক জগতের এক অপূরণীয় ক্ষতি।” পাশাপাশি বর্ষীয়ান সাহিত্যিকের শোকসন্তপ্ত পরিবার-পরিজন ও অগণিত গুণগ্রাহীর উদ্দেশেও সমবেদনা জানিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী।
গত শতকের তিনের দশকে, ১৯৩৩ সালে বনগাঁয় জন্ম শংকরের। তবে ছোট বয়সেই সপরিবারে চলে আসেন হাওড়ায়। কিশোর বয়সেই হারান বাবাকে। গ্রাসাচ্ছেদনের জন্য শুরু হয় লড়াই। একার কাঁধে সংসারের জোয়াল টানতে কখনও কেরানির কাজ যেমন করেছেন, করেছেন হকারিও। আর সেই সূত্রেই কলকাতা হাইকোর্টের শেষ ইংরেজ ব্যারিস্টার নােয়েল ফ্রেডারিক বারওয়েলের অধীনে চাকরি। সেই অভিজ্ঞতা থেকেই লেখেন ‘কত অজানারে।’ এরপর আর পিছনে ফিরে তাকাতে হয়নি শংকরকে। বাংলা সাহিত্য পেল এক নতুন সাহিত্যিককে। তবে তাঁকে প্রকৃত জনপ্রিয়তা দিয়েছিল ‘চৌরঙ্গী’। শাজাহান হোটেলের সুখ-দুঃখের সেই আখ্যান শংকরকে ঘরে ঘরে পৌঁছে দেয়। আজও এই অমোঘ গ্রন্থটি বেস্ট সেলার। পরবর্তী সময়ে একে একে তাঁর কাছ থেকে বাঙালি পাঠক পেয়েছে ‘সীমাবদ্ধ’, ‘জন অরণ্য’, ‘নিবেদিতা রিসার্চ ল্যাবরেটরি’, ‘সম্রাট ও সুন্দরী’, ‘চরণ ছুঁয়ে যাই’-এর মতো অসামান্য অসংখ্য সৃষ্টি। যা ক্রমেই শংকরকে খ্যাতির শিখরে পৌঁছে দিয়েছে। লেখালেখির জন্য পেয়েছেন অসংখ্য পুরস্কার। যার মধ্যে অন্যতম ২০২১ সালে ‘একা একা একাশি’র জন্য সাহিত্য আকাদেমি পুরস্কার, ১৯৯৩ সালে ‘ঘরের মধ্যে ঘর’-এর জন্য বঙ্কিম পুরস্কার। শংকরের তিনটি উপন্যাস নিয়ে তৈরি হয়েছে সিনেমা। এর মধ্যে সত্যজিৎ রায় পরিচালনা করেছিলেন ‘সীমাবদ্ধ’, ‘জন অরণ্য’। নাগরিক অবক্ষয়ের অসামান্য দলিল হয়ে রয়েছে ছবি দু’টি। পিনাকিভূষণ মুখোপাধ্যায় নির্মাণ করেছিলেন ‘চৌরঙ্গী’। সেই ছবিতে উত্তমকুমারের ‘স্যাটা বোস’ তাঁর জীবনের অন্যতম শ্রেষ্ঠ চরিত্র হয়ে রয়েছে।